April 5, 2020, 3:15 pm

স্নায়ুযুদ্ধে জাপা-আ.লীগ, হাসিনাতেই ভরসা বিএনপির

নভেম্বরেই হতে পারে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা। সে লক্ষ্যেই এগোচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোও। ২০০১ সাল থেকে চলছে জোটগত নির্বাচন। সে হিসাবেই বিভিন্ন আসন নিজেদের মাঝে রাখতে স্নায়ুযুদ্ধে নেমেছেন জোটের শরিকরা। তেমনি একটি আসন চকরিয়া-পেকুয়া উপজেলা নিয়ে কক্সবাজার-১ আসন। বর্তমানে এখানে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) মৌলভী মো. ইলিয়াছ।

২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হওয়া ইলিয়াছ এবারও নির্বাচনের লড়ার ইচ্ছা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রচারণা শুরু করেছেন। প্রতিদিন চষে বেড়াচ্ছেন পেকুয়া-চকরিয়ার মাঠ-ঘাট। কিন্তু ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাওয়ার পরও চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম জোটগত সিদ্ধান্তে জাপা প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তাই এবার আর সে সুযোগ তিনি দেবেন না জানিয়ে চার বছর ধরে মাঠে রয়েছেন।

এদিকে মনোনয়ন নিয়ে নিজেদের ভেতর রশি টানাটানি থাকায় জাপার বর্তমান এমপি জোটগত ভাবে তার মনোনয়ন এক প্রকার নিশ্চিত ধরে নিয়েই মাঠে জোর প্রচারণায় রয়েছেন বলে বোদ্ধা মহলের ধারণা।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চকরিয়া-পেকুয়া আসনটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের পর থেকে এই আসনে আওয়ামী লীগ জয়ের স্বাদ পায়নি। গেল নির্বাচনেও কৌশলগত কারণে জোটের শরীক দলকে আসনটি ছেড়ে দেয়ায় নির্বাচনে অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম নৌকা প্রতীক নিয়ে এ আসনে জিতেছিলেন। এরপর আর জয়ের স্বাদ পায়নি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। তাই কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনকে আওয়ামী লীগের জন্য নেগেটিভ হিসেবে ধরা হয়।

তবে এবার পরিস্থিতি পাল্টেছে। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন শক্তিশালী প্রার্থী দিতে পারলে জয় আসবে আওয়ামী লীগের ঘরে। জাপা-আওয়ামী লীগ নিজেদের যোগ্য মনে করায় কে মনোনয়ন পাচ্ছে সেটা নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধে রয়েছে স্থানীয় নেতারা।

অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ চকরিয়া-পেকুয়া আসন থেকে ১৯৯৬ সালে ধানের শীষ প্রতীকে প্রথম জয় নিয়ে সংসদে যান। খালেদা-তারেক পরিবারের কাছের জন হিসেবে স্থানীয় বিএনপি পরিবারের কাছে তিনি ‘সোনায় সোহাগা’ হিসেবে পরিচিত। এর রেশে ২০০১ সালের নির্বাচনে ফের জয়ী হয়ে দায়িত্ব পান সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর। এরপর রূপকথার মতো পাল্টাতে থাকে অজোপাড়া পেকুয়া ও আশপাশের চিত্র। ফলে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেই তাকে মানতে শুরু করে এলাকার মানুষ। তাই ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি নির্বাচনে দাঁড়াতে অক্ষম হলেও তার স্থলে স্ত্রী হাসিনা আহমেদ হেসে খেলেই জয় পান।

অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনেও সালাউদ্দিন আহমেদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। কারণ তিনি অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের অপরাধে শিলংয়ে আইনি লড়াই লড়ছেন। তিনি আসতে না পারলেও ২০০৮ সালের মতো একাদশ নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। তাই প্রার্থী নিয়ে এক প্রকার দ্বিধাহীন রয়েছে বিএনপি।

অন্যদিকে এ আসন থেকে প্রার্থী হতে পারেন জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সাবেক এমপি এএইচএম সালাহউদ্দিন মাহমুদ। তিনিও সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নানা সভা-সেমিনার এবং অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের প্রার্থিতার বিষয়ে জানান দিচ্ছেন। যোগাযোগ রাখনে কেন্দ্রেও।

জানা যায়, জাতীয় সংসদের (২৯৪) কক্সবাজার-১ আসনটি চকরিয়া-পেকুয়া দুই উপজেলার ২৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। দুই উপজেলার বর্তমান ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৯০ হাজার ৬৮১ জন।

এ আসন থেকে ১৯৯১ সালে জামায়াত প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু ও ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন আহমদ দু’বারই এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমদ কারাবন্দী থাকায় স্ত্রী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমেদ বিএনপির টিকিটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাউদ্দিন আহমদ সিআইপিকে ৩৫ হাজার ৪০১ ভোটে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন।

পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী ও কক্সবাজার জেলা জাপার সভাপতি হাজি মোহাম্মদ ইলিয়াছ।

বর্তমানে আওয়ামী লীগ থেকে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে নির্বাচনী এলাকায় একাধিকজন মাঠে থাকলেও প্রচারণা ও জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছেন চকরিয়া উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম।

চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আলমের পাশাপাশি বর্তমানে চকরিয়া-পেকুয়া আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন আরো ৪ প্রভাবশালী নেতা। তারা হলেন- জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম সজিব, সদস্য রাশেদুল ইসলাম এবং জেসমিন সুলতানা (শামসাদ)।

নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম বলেন, চারদলীয় জোটের আমলে অবর্ণনীয় নির্যাতনের পরও দলের তৃণমূল শক্তিশালী করতে চকরিয়া-পেকুয়ায় বিরামহীন কাজ করছি। যার স্বীকৃতিস্বরূপ নেত্রী আমাকে গতবার মনোনয়ন দিয়েছিলেন। কিন্তু জোটগত স্বার্থে জাপাকে সেটি ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস নেত্রী এবার আমাকে আবার মনোনয়ন দেবেন এবং সকলের সহযোগিতায় আমি জয় ছিনিয়ে আনতে পারবো।

মনোনয়ন প্রত্যাশী রেজাউল করিম, রাশেদুল ইসলাম এবং আশরাফুল ইসলাম সজিব বলেন, আমরা আওয়ামী লীগ তথা নৌকার কর্মী। নেত্রীর কাছে মনোনয়ন চেয়েছি। তিনি যাকে যোগ্য মনে করবেন মনোনয়ন দেবেন।

এএইচএম সালাহউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার জন্য আমাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল কেন্দ্রীয়ভাবে। কিন্তু সেই প্রস্তাব আমি নাকচ করেছিলাম। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদি দল চায় তাহলে অবশ্যই মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব।

অপরদিকে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের চূড়ান্ত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। ২০০৮ সালেও স্বামীর অনুপস্থিতিতে নির্বাচন করে জয় পাওয়ায় এবারও তার (হাসিন আহমেদ) নামই প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে জেলা বিএনপি।

Comments are closed.


     এই জাতীয় আরো খবর