May 26, 2020, 1:11 pm

আলোকচিত্রী শহীদুল আলম ৭ দিনের রিমান্ডে

জনকণ্ঠ নিউজঃআলোকচিত্রী শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে রমনা থানায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলায় সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার অতিরিক্ত ঢাকা মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূর আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এদিকে বিশ্বখ্যাত ফটোগ্রাফার শহীদুলের আটকের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক কভারেজ দেওয়া হচ্ছে।

১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের (পরিদর্শক) আরমান আলী। শহীদুলের পক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও জোতির্ময় বড়ুয়া রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্র পক্ষ থেকে এর বিরোধিতা করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক সাত দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

জানা যায়, দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা শহীদুল আলম চলমান ছাত্র আন্দোলন নিয়ে সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ওই ঘটনায় রমনা থানার তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। বিকেলে ডিবি (উত্তর) পরিদর্শক মেহেদী হাসান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

প্রখ্যাত আলোকচিত্রী এবং অ্যাক্টিভিস্ট শহীদুল আলমকে রবিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে যায় সাদা পোশাকের একদল লোক৷ স্থানীয় সময় রবিবার দিবাগত রাতে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে শহীদুল আলমের দেখা পাওয়ার আশায় অপেক্ষারত তার স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বাসার নিরাপত্তা কর্মী আমাকে জানিয়েছেন, ডিবি পরিচয়ে লোকজন বাড়িতে ঢুকে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে গেছে৷ তারপর ক্যামেরার উপরে কশটেপ লাগিয়ে উপরে গিয়ে শহীদুলকে জোর করে নীচে নামিয়ে এনেছে এবং হাইরেস গাড়িতে তুলেছে৷ বাসার বাইরে তখন আরো দু’টি গাড়ি অপেক্ষমান ছিল, যার একটির লাইসেন্স নম্বর জানা গেছে৷’

ঘটনার সময় একই ভবনের আরেকটি তলায় অবস্থান করছিলেন রেহনুমা আহমেদ৷ তিনি বলেন, ‘শহীদুলকে যে ফ্ল্যাট থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানকার সবকিছু আগে যেমন ছিল তেমনই আছে৷ শহীদুলের স্যান্ডেলও আছে৷’

শহীদুলকে সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পরপরই ধানমন্ডি থানায় যান রেহনুমা৷ সেখানে দায়ের করা অভিযোগে তিনি তার স্বামী এবং সহকর্মী শহীদুল আলমকে ‘অক্ষত অবস্থায় দ্রুত উদ্ধারের’’ জন্য পুলিশের প্রতি আর্জি জানান৷

রবিবার রাতভর শহীদুলকে কারা তুলে নিয়ে গেছে তা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও সোমবার তাকে গ্রেফতারের কথা নিশ্চিত করে পুলিশ৷ পুলিশ কর্মকর্তা মশিউর রহমান বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘তাকে সোমবার ভোরে আমাদের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে৷ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভুল তথ্য এবং ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দেয়ার বিষয়ে আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি৷’’

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি (শহীদুল আলম) কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি৷ তিনি স্বীকার করেছেন, সেগুলো তার ব্যক্তিগত মতামত ছিল৷’

এর আগে, রবিবার দিবাগত রাতে ঢাকার ইউএনবি সংবাদ সংস্থা এক প্রতিবেদনে জানায় গোয়েন্দারা শহীদুল আলমকে আটক করেছে৷ সংবাদ সংস্থাটি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেনকে উদ্বৃতি করে লিখেছে, ‘‘চলমান ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে ফেসবুকে শহীদুল আলমের কিছু পোস্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আটক করা হয়েছে৷’’

প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিন ধরে ঢাকায় চলা স্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানা ধরনের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করছিলেন শহীদুল আলম৷ শনিবার ধানমন্ডিতে ছাত্র বিক্ষোভের ছবি তুলতে গেলে ছাত্রলীগের বাঁধার মুখে পড়েন তিনি৷ সেসময় তার ক্যামেরা ভেঙে যায়৷ এমনকি তিনি ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দেয়ার সময়ও তাকে বাধা দেওয়া হয় এবং তার মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে দুই যুবক৷ রবিবার রাতে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কয়েকঘণ্টা আগেও তিনি কাতারভিত্তিক আল-জাজিরা টেলিভিশন চ্যানেলে এক সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে রাজপথে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দল ছাত্রলীগের হামলার তীব্র সমালোচনা করেন৷

রেহনুমা আহমেদর জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতার চর্চার বাইরে অবৈধ কিছু করেননি শহীদুল আলম৷ তবে তাকে যেভাবে রাতের বেলা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেটা অবৈধ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি৷ উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ফোটোগ্রাফির জগতে এক মাইল ফলক দৃক৷ মানবাধিকারের পক্ষে, সুশীল সমাজের জোরালো কণ্ঠ হিসেবেও সক্রিয় প্রতিষ্ঠানটির স্থপতি ও প্রাণপুরুষ শহীদুল আলম৷ নিজের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন তিনি৷

স্ত্রী রেহনুমা আহমেদের সংবাদ সম্মেলন
সোমবার সকালে ঢাকার দৃক গ্যালারিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে শহীদুল আলমকে কেন বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে তার পরিবারকে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ। ওই সংবাদ সম্মেলনে রেহনুমা আহমেদ বলেন, ‘শহীদুল আলমকে তুলে নেয়ার ব্যাপারে আমরা অফিশিয়ালি কোনো তথ্য পাইনি। আমরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানি না তিনি কোথায়? সকালে ডিবি অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, ভেতরের কারও কোনো তথ্য দেওয়ার নিয়ম নেই। সকালে দেখলাম একটা গাড়িতে করে তাকে বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে কোথায় নেওয়া হচ্ছে আমরা এখনও জানি না। আমরা জানতে চাই, তার কী অপরাধ?’

ফেসবুক লাইভে সরাসরি সম্প্রচারিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, আইনজীবী সারা হোসেন, বেসরকারী সংগঠন নিজেরা করি’র খুশী কবির এবং গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি।

যেকোনো নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাবাদের জন্য আটক করার আইনী বিধান রয়েছে উল্লেখ করে সারা হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী যদি কাউকে গ্রেফতার করা হয় তাহলে যথাশিঘ্র তার পরিবারকে আটকের কারণ জানাতে হবে। আটক ব্যক্তিকে তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এছাড়া বেআইনিভাবে কারো গৃহে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ, সেই সঙ্গে নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যমের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারটি সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।’

পুলিশ যদি এই নির্দেশনা না মানে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নিতে পারবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান সারা হোসেন।

এদিকে সরকারকে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার মতো কাজ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি করতে হবে। সরকার যদি মনে করে যে তারা সঠিক কাজ করছে, তাহলে ভীতি কিসের? ক্রমাগত সংবিধান লঙ্ঘনের কারণে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কোথায় ঠেকেছে?’ এ সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনানুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান।

শহীদুল আলমের নিঃশর্ত মুক্তি চায় সিপিজে
বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস-সিপিজে। রবিবার বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন এই সংগঠনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
সিপিজের এশিয়াবিষয়ক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর স্টিভেন বাটলার বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই শহীদুল আলমকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। কর্তৃপক্ষের উচিত আলমসহ ঢাকার সংঘাতের খবর সংগ্রহে নিয়োজিত সব সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেন তারা হামলা ও গ্রেফতার আতঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে।’

সিপিজের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের সদস্য পরিচয় দিয়ে এক দল লোক বাংলাদেশি ফটোগ্রাফার এবং দৃক ও পাঠশালা মিডিয়া ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা শহীদুল আলমকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলার সময় এপির ফটো সাংবাদিকসহ অন্তত পাঁচ সংবাদকর্মীর ওপর হামলা হয়েছে।

বিবৃতিতে শহীদুল আলমের বাসার নিরাপত্তারক্ষীদের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের সদস্য পরিচয় দিয়ে কমপক্ষে ৪০ জনের একটি দল জোর করে শহীদুলকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই দলটি ভবনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলেছে এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা নষ্ট করে দিয়েছে।

সিপিজে জানিয়েছে, সংগঠনটির পক্ষ থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ডিএমপি কমিশনার ও ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চকে ফোন করে সাড়া পাওয়া যায়নি। ডিএমপি কমিশনারের কাছে একটি ই-মেইলও করা হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ই-মেইলের উত্তরও পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত কমিশনারের কাছেও ফোন করেছে সিপিজে। এক ব্যক্তি ফোনটি রিসিভ করে বলেছিলেন, তিনি গ্রেফতারের ব্যাপারে নিশ্চিত নন। এরপর ফোনটি কেটে যায়। ধানমন্ডি পুলিশ স্টেশনেও ফোন করে সাড়া পায়নি সিপিজে।

Comments are closed.


     এই জাতীয় আরো খবর